Printfriendly

মহররম মাস ও আশুরার ফজিলত

মুহাররম মাস ও আশুরার ফজিলত



আরবী বার মাসের প্রথম মাস মহররম। হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,যে ব্যক্তি মহররম চাঁদের প্রথম রাত্রে দুই দুই রাকাত করে আট রাকাত নফল নামাযের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর দশবার সুরা ইখলাস পাঠ করে, আল্লাহ পাক তার ধন দৌলত ও সন্তান সন্তুতিতে সারাবছর সর্ব প্রকার বালা মুসিবত থেকে নিরাপদ রাখেন এবং বিগত বছরের সব সগীরা গোনাহ ক্ষমা করে দেন, তবে শর্ত হল নামায আদায়কারী ও তার পরিবার পরিজন শিরক,বিদায়াত হতে পবিত্র হতে হবে।

যে ব্যক্তি প্রথম তারিখ দিনে দুই রাকাত নফল নামায পাঠ করে নামাযের সালাম ফিরানোর পর নিম্নের দোয়া পাঠ করে আল্লাহ পাক তার হেফাজতের জন্য একজন ফেরেশতা পাঠান, সেই ফেরেশতা সারাবছর ঐ ব্যক্তিকে শয়তানের ধোঁকা হতে রক্ষা করার চেষ্টা করে, আর নেক কাজে সহায়তা করে, দোয়াটি এই-

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আন্তাল আবাররুল ক্বাদিম,ওয়াহাযিহী সানাতুন জ্বাদীদাহ, ইন্নী আস্আলুকা ফীহাল ইসমাতা মিনাশ শাইত্বানির রাজ্বীম ওয়া আউলিয়াইশ শাইত্বান, ওয়াকিনা মিন শাররিল বালায়া ওয়াল আফাত,ওয়ালআউনা আলা হাযিহিন নাফসিল আম্মারাতি বিসসূই ওয়াল ইশতিগালিবিমা ইয়ুক্বাররিবুনী ইলাইকা, ইয়া যালজ্বালা-লি ওয়াল ইকরাম।

অর্থ- হে আল্লাহ! তুমি চির পূন্যময় চিরস্থায়ী এবং অপরিবর্তনশীল, এটি নতুন বছর। আমি তোমার পবিত্র দরবারে এই কামনা করি যে,তুমি আমাকে এই বছর শয়তান ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের ষড়যন্ত্র হতে নিরাপদে রেখ। আর সমুদয় বালা-মুসীবত হতে রক্ষা কর। আমার নিজ কূ-রিপুর সাথে লড়াই করে জয়ী হওয়ার জন্য আমাকে সাহায্য কর। আর যে কাজের দ্বারা তোমাকে পাওয়া যাবে, আমাকে সে কাজে লিপ্ত রেখ! হে মহিমায় ও মহানুভব খোদা।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোযা রাখে,সে দশ হাজার বছর যাবত দিনে রোযা ও রাত্রে এবাদতের নেকী পাবে।মহররম মাসের ৯ তারিখের দিবাগত রাত্রিকে আশুরার রাত্রি বলে, এই রাত্রে হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহ পাকের সাথে তুর পাহাড়ে কথা বলে ছিলেন এবং তাওরাত কিতাব পেয়েছিলেন। এই রাত্রে ৪ রাকাত নফল নামাযের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা এখলাস ৫০ বার করে পড়লে তার ৫০বছরের পাপ মাফ হবে। যে ব্যক্তি আশুরার দিনে দুই রাকখত করে চার রাকাত নফল নিয়তে নামায প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা যিলযাল একবার, সূরা কাফিরুন একবার এবং সূরা ইখলাস একবার অতঃপর নামায শেষে ১০০ বার দরুদ শরীফ পড়বে, তাহলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তাকে সর্বপ্রকার বিপদ হতে মুক্ত রাখবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- যে ব্যক্তি আশুরার রোযা রাখে আল্লাহ পাক তাকে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের দশ হাজার হাজীর নেকী দিবেন। তিনি আরও বলেন সমস্ত পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণ দান করেও কেউ আশুরার দিন রোযা রাখার পরিমান নেকী লাভ করতে পারবে না। যে ব্যক্তি আশুরার রোযা রাখে তার জন্য আটটা বেহেশতের দরজা খুলে যায়, সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন,হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন_ যে ব্যক্তি আশুরার রোযা রাখে সে জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে না। যে ব্যক্তি আশুরার দিন কোন মোমিনের রোযার ইফতার করাল সে যেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর সমস্ত উম্মতের রোযার ইফতার করাল, যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ হাত কোন এতিমের মাথায় বুলাইবে, আল্লাহ পাক তাকে এতিমের মাথার কেশ বরাবর নেকী দান করিবেন।  

মুহররম মাসের দশম দিন ইসলামে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন একটি দিন। প্রচলিত আছে যে, এই দিনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল যার জন্য । ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

-এই দিনে প্রথম মানব আদি পিতা আদম-কে সৃষ্টি করেন আল্লাহ।

-আদম-কে এদিনেই স্বর্গ বা জান্নাতে স্থান দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে এই দিনেই পৃথিবীতে পাঠিয়ে আল্লাহ তাকে প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন।

- নূহ-এর সময়কালে এই দিনে মহাপ্লাবন হয়।

-ইব্রাহীম জন্ম নেন এই দিনে এবং মূসা ও তার সাথীরা ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার পানও এই দিনে।

-মূসার সমসাময়িক ফেরাউন ও তার সৈন্যদেরকে আল্লাহ এই দিনে নীল নদের পানিতে ডুবিয়ে মারেন।

-ইউনুছ মাছের পেট থেকে মুক্তি পান এই দিনে।

-আইয়ূব রোগ মুক্তি পান এই দিনে।

-ঈসা (খ্রিস্টধর্মমতে যিশু) এই দিনে জন্ম নেন এবং পরবর্তিতে তাকে সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এই দিনে।

-নবী মুহাম্মদ-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এই দিন কারবালার ময়দানে ইয়েজিদের সৈন্যদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন।

আশুরার রোজা সব নবীর আমলেই ছিল। নবী করিম (সা.) মক্কায় থাকতেও আশুরার রোজা পালন করতেন। হিজরতের পর মদিনায় এসে নবীজি (সা.) দেখতে পেলেন, ইহুদিরাও এই দিনে রোজা রাখছে। প্রিয় নবী (সা.) তাদের এই দিনে রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলেন। জানতে পারলেন—এদিনে মুসা (আ.) সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত কিতাব লাভ করেন। এই দিনেই তিনি বনি ইসরাইলদের ফেরাউনের জেলখানা থেকে উদ্ধার করেন এবং তাদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন। আর ফেরাউন সেই সাগরে ডুবে মারা যান। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ইহুদিরা এই দিন রোজা রাখে।

মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ ও অগ্রগণ্য। এরপর তিনি ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ মহররম অথবা ১১ মহররম মিলিয়ে ২টি রোজা রাখতে বললেন। কারণ, ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের যেন সাদৃশ্য না হয়। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হলে আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। তবে রমজানের রোজা রাখার পর আশুরার রোজা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এ মাসের নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত রমজান মাস ব্যতীত অন্য যেকোনো মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম। (মুসলিম ও আবু দাউদ)।

১০ মহররম আশুরার রোজা রাখা সুন্নত। আশুরার দিনে ও রাতে নফল নামাজ পড়া। মহররম মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বিদের সুন্নত রোজা; ২০, ২৯ ও ৩০ তারিখ নফল রোজা এবং প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার সুন্নত রোজা। এ মাসে প্রতি রাতে ১০০ বার দরুদ শরিফ ও ৭০ বার ইস্তিগফার পড়া অত্যন্ত ফজিলতের আমল। [তরিকত শিক্ষা, খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (রহ.) পৃষ্ঠা: ৩০ ও ৯৬; রাহাতুল কুলুব, ইমাম রাজিন (রহ.)]।

আশুরার রোজা রাখার চারটি নিয়ম রয়েছে: যথা—প্রথম থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত মোট ১০টি রোজা রাখা। তা সম্ভবপর না হলে ৯, ১০ ও ১১ তারিখ মোট ৩টি রোজা রাখা। তাও সম্ভব না হলে ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ মিলিয়ে ২টি রোজা রাখা। এটাও সম্ভব না হলে শুধু ১০ তারিখে ১টি রোজাও রাখা যাবে। যদি কেউ শুধু ১০ তারিখে রোজা রাখেন এবং ৯ বা ১১ তারিখ রাখতে না পারেন; তবে এই ১টি রোজার জোড়া মেলানোর জন্য অন্য দিন রোজা রাখার প্রয়োজন হবে না।

হজরত কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা এর অছিলায় অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি ও মুসনাদে আহমাদ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে করিম (সা.) বলেন, ‘রমজানের রোজার পরে মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ; যেমন ফরজ নামাজের পরে শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।’


লিখেছেনঃ সুমাইয়া হক্ব (আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন।আমিন)  

Post a Comment

0 Comments