Printfriendly

শুক্রবার কি শুধুই ছুটির দিন?

শুক্রবার কি শুধু জুম্মার দিন


সবাইকে"জুম্মা মোবারক"
সাথে পাঞ্জাবী পড়া কিউট একটা ছবি।
৩০ মিনিটে ১ হাজার লাইক। আহা.... মনটাই ভালো হয়ে গেল রিয়াদের। কমেন্টগুলা দেখার মতো।
ফ্রেন্ডলিস্ট এর এক আন্টি লিখেছে...এমন নামাজী ছেলেই তো চাই!
আর এক আঙ্কেল লিখেছে...মাশাআল্লাহ। জামাই আমার নম্বর ওয়ান।
এক বান্ধবীর কমেন্ট...ইনোসেন্ট আত্মা💞

মাসে এক দুইদিন জুমা পড়া হয়। আর যেদিন জুমা পড়া হয় সেদিন "স্ট্যাটাস তো বানতা হ্যা".....

স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ থাকলেও অনলাইন ক্লাস বন্ধ নেই। প্রতিদিনই ক্লাস করতে হয় রিয়াদের। আর এসাইন্টমেন্ট তো আছেই। সব বন্ধ হয়েই বা কি লাভ? সেই তো এক পড়ালেখা! আর ভালো লাগেনা!

যাক বাবা তাও বাঁচা গেছে। শুক্রবার টা একটু আরামে কাটানো যায়। ক্লাস, এসাইনমেন্ট সব থেকে মুক্ত। সকালে উঠার তাড়া নেই। এক ঘুমে দুপুর।
দুপুরের খাবার খেয়ে প্রিয় কোনো মুভি নয়তো সাইকেল নিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া। আড্ডা, গান, খাওয়া দাওয়া। আহ্ যেন বিন্দাস একটা দিন!

[২]
বেলা ১১ টা। রফিক সাহেব এবং তার স্ত্রী আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠছেন। এটা তাদের নিত্যদিনের রুটিন। প্রতিদিন ১০ টায় উঠা হলেও ছুটির দিনে আর একটু বেলা করেই ওঠা হয়।
অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয় বলে সকালে অফিস যাওয়ার তাড়া থাকে না রফিক সাহেবের।

ভার্সিটি পড়ুয়া একমাত্র ছেলে সারারাত মুভি দেখে সকালে ঘুমায়। উঠে দুপুর বেলা। এটা অবশ্য তাদের জন্য সোনায় সোহাগা বলা যেতে পারে। এজন্য সকাল সকাল ওঠার তাড়া নেই। তাই ছুটির দিনটা আরাম করে ঘুমান আর আয়েশ করে সব কাজ করেন রফিক সাহেব।

বেলা ১২ টায় সকালের নাস্তা শেষ করে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। বাজার থেকে ফিরে গোসল সেরে বের হতেই জুমার সময় শেষ! তাই বাসায়ই পড়া হয় জোহরের নামাজ।

কত শুক্রবার যে জুমা পড়া হয়না তার হিসাব নেই! করোনার ভয়ে মসজিদে যান না রফিক সাহেব! অথচ বিকালে চায়ের আড্ডা, জন্মদিনের পার্টি, বিয়ের দাওয়াত, অফিসের মিটিং,পার্টি সব অনুষ্ঠানেই আগে আগে উপস্থিত হন। শুধুমাত্র জুমা পড়তে মসজিদে যাওয়ার বেলায় যত আপত্তি। ভাবখানা এমন যে, করোনার বীজ সব মসজিদেই বপন করা আছে!

[৩]
ছেলেরা বাইরের খাবার খেতে পছন্দ করে। মাঝে মাঝে বাইরে নিয়ে খাওয়ান। কিন্তু সারা সপ্তাহ অফিস করে ছুটির দিনটা তিনি মিস করতে চান না মিসেস বন্যা। ছুটির দিনে তাই চেষ্টা করেন বাসাতেই বাইরের মত খাবার তৈরি করে ছেলেদের রসনার স্বাদ জুগাতে।

ঘুম থেকে উঠেই রান্নার কাজে লেগে যান তিনি। কোনদিন মোরগ পোলাও, কোনদিন কাচ্চি, আবার কোনদিন চাইনিজ। সারা দুপুর রান্নাঘরেই কেটে যায়! গোছল সেরে কোন রকমে ওয়াক্ত শেষে জোহর পড়েন।
 
১০ বছর বয়সী ছোট ছেলেটা আবার নিজ হাতে খেতে পারেনা। তাই দ্রুত নামাজ শেষ করে ছেলেকে খাওয়াতে বসেন তিনি। খাওয়া শেষে একটু রেস্ট নেবার জোগাড়ও নেই। বিকাল হতে না হতেই হয় ছাদে ভাবীদের আড্ডায় যোগ দিতে হয় আর তা না হলে ভাবিরাই চলে আসেন তার বাসায়। সন্ধ্যার পর পর্যন্ত চলে তাদের চায়ের আড্ডা। আর আড্ডায় চলে জম্পেশ পরণিন্দা!

...…..….…........……...................…........….…...……...

শহুরে জীবনের বরকতময় জুমার দিন টা এভাবেই অবহেলায় কেটে যায়!
অসংখ্য চাকুরীজীবী রফিক সাহেবরা আরাম আলস্যে কাটান তাদের ছুটির দিন! মিসেস বন্যারা মজে উঠেন গীবতের আড্ডায়, আর রিয়াদের মত ছেলেদের সময় কাটে মুভি আর ঘুরাফেরায়! তাদের কাছে জুমাবার কেবলই ছুটির দিন! কিন্তু, আসলেই কি তাই?

✓রাসুল (সা:) বলেছেন, মুমিনের জন্য জুমার দিন হলো সাপ্তাহিক ঈদের দিন[১]

✓এবং তিনি (সা:) আরো বলেন, জুমার দিন দিবসসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তা আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত।[২]

জুমার গুরুত্ব আল্লাহ তায়ালার কাছে এত বেশি যে, কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা নাজিল করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিন যখন নামাজের আহ্বান জানানো হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে (মসজিদে) এগিয়ে যাও এবং বেচা-কেনা (দুনিয়াবি যাবতীয় কাজকর্ম) ছেড়ে দাও। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; যদি তোমরা জানতে।’ (সূরা জুমা: ০৯)।

আর জুমার নামাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময়। আমরা অনেকেই জুমার নামাজকে অবহেলা করে থাকি। অযথা ও বিনা কারণে জুমার নামাজ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে শরিয়তে কঠিন সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে।

✓রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি অবহেলা করে তিন জুমা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তার হৃদয় মোহরাঙ্কিত করে দেন।[৩]

জুমার দিনের আরেকটি বিশেষ আমল হচ্ছে নবীজীর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
✓এই মর্মে রাসূল সা: বলেন, "তোমরা এই দিনে আমার ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করো। কেননা তোমাদের দরুদ আমার সম্মুখে পেশ করা হয়ে থাকে"।[৪]

জুমাবারের ফজিলতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, এই দিনে এমন একটা সময় আছে, যখন মুমিন বান্দা কোনো দোয়া করলে মহান আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন।

✓আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে একটা এমন সময় আছে, যে সময়ে কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে ভালো কোনো কিছু প্রার্থনা করলে, অবশ্যই আল্লাহ তাকে তা দান করবেন।[৫]

জুমার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সে মহামূল্যবান সময় কোনটা? এ সম্পর্কে ৪৫টা মতামত পাওয়া যায়। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত হলো, আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত দোয়া কবুলের সময়।

✓হজরত আনাস (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনের কাঙ্ক্ষিত সময়টা হলো আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।[৬]

অথচ দুয়া কবুলের এই সময় টা আমরা কত অবহেলায় কাটিয়ে দেই! আড্ডা, গান বাজনা, ঘুরাফিরা, মুভি নিয়ে ব্যস্ত থাকি!
আল্লাহ আমাদের সবাইকে জুমার ফযীলত সম্পর্কে জানার ও মানার তৌফিক দান করুন আমিন। অনাগত
শুক্রবার গুলো শুধু ছুটির দিন না হয়ে সত্যিকারের জুমাবার হয়ে উঠুক সকলের কাছে....

রেফারেন্স:
১।ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১০৯৮।
২।ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ১০৮৪।
৩।তিরমিজি হাদিস নং : ৫০২।
৪।আবু দাউদ, হাদিস নং : ১০৪৭।
৫।সহীহ মুসলিম: ৮৫২, মুসনাদে আহমাদ: ৭১৫১, আস্-সুনানুল কুবরা : ১০২৩৪।
৬।তিরমিজি, হাদিস নং: ৪৮৯; মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং : ৫৪৬০।


লেখিকাঃ শেফাত-ই-সুলতানা

Post a Comment

0 Comments