Printfriendly

ঐতিহাসিক উপন্যাস "দাস্তানে মুজাহিদ" [পর্ব-০৮]

ধারাবাহিক উপন্যাস


সামনে কামরা থেকে চুপি চুপি করে  ধীরে ধীরে এক বালিকা এসে দাঁড়ালো ইবনে সাদকের সামনে। সে কখনো পেরেশান বেকারার হয়ে তাকাচ্ছে নাইমের দিকে, আবার কখনো অনুনয় ভরা দৃষ্টিতে তাকাছে ইবনে সাদেকের দিকে।মেয়েটির নাজুক নরম অন্তর আর বরদাশত করতে পারছে এ নিষ্ঠুর খেলা।অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে সে ইবনে সাদেকের দিকে তাকিয়ে বলল! চাচা লোকটি বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছে।
:হতে দাও, আমি ওর তেজ আজ খতম করে ছাড়বো।
:চাচা.........!
:ইবনে সাদেক বিরক্ত হয়ে বললেন! চুপ করো জুলাইখা! এখানে কি চাও? যাও.....!

জুলাইখা সেখান থেকে ফিরে গেলেন।জুলাইখা দু'একবার পিছন ফিরে তাকালেন।
আঘাতের তীব্রতায় নাইমের শরীর যখন দূর্বল হয়ে পড়লো তখন আবার তাকে ফেলে রাখা হলো কয়েদখানায়। নাইমকে আবার বাইরে নিয়ে কোড়া মারা হলো।এত শাস্তি প্রয়োগ করার পরও যখন নাইমের মনোভাব পরিবির্তন হলো না তখন ইবনে সাদেক হুকুম দিলেন কয়েকদিন তাকে ভূখা রাখতে হবে।
নানারকম শারীরিক কষ্ট সহ্য করার পর নাইমের ভিতরে এলো এক অস্বাভাবিক সহনশক্তি। তিনি ক্ষুধ-পিপাসায় কাতর হয়ে যখন রাতে ঘুমাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন,তখন কে যেন বাইরে থেকে কুঠরির ছিদ্র দিয়ে কয়েকটি আপেল ও আংগুর ফল ফেলে দিল। নাইম হয়রান হয়ে ছিদ্র দিয়ে উকি মেরে দেখলেন,কে যেন কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।তার লেবাস ও চলার ধরণ দেখে নাইম আন্দায করলেন কোন নারী গা-ঢাকা দিয়ে রাতের অন্ধকারে চলে যাচ্ছে।দরদী মেয়েটিকে চিনে নিতে তার কোন কষ্ট হলো না, কোঁড়ার ঘা খেয়ে নাইম যখন বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছেন তখন কতবার তিনি মেয়েটিকে দেখেছেন তার জন্য অস্থির বেকারার হতে।তার নিষ্পাপ সুন্দর মুখের ওপর জুলুম ও অসহায়তার চিহ্ন অংকিত হয়ে গেছে নাইমের হৃদয় ফলকে।কিন্তু কি তার পরিচয়? কে সে? আমার ব্যথায় সে কেন ব্যথিত  হয়? নাইম এসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে একটি আপেল নিয়ে খেতে লাগলেন।

নাইমের জন্য এতটা বেদনাবোধ যে মেয়েটির তার নাম জুলাইখা।জীবনের ষোলোটি বছর অন্তহীন মসিবতের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েও সে ছিল দৈহিক সৌন্দর্যের এক পরিপূর্ণ প্রতিক। প্রতিটি মানুষের প্রতি অন্তহীন বিদ্বেষ পোষণ করতো জুলাইখা।ইবনে সাদেকের সাহচর্যে সে কাটিয়েছে তার জিন্দেগীর তিক্ত মূহুর্তোগুলো এবং সর্বদা মানবতার নিকৃষ্ট রুপই রয়েছে তার চোখের সামনে।তাই প্রত্যেক মানুষই তার কাছে ছিল ইবনে সাদেকের মত ধূর্ত, নিষ্ঠুর, কমিনা, কমজাত, মেচকে শয়তান।শিকল বাধা নাইমকে কেল্লায় আনতে দেখে জুলাইখার মনে হয়েছে একটি স্বার্থপর মানুষ আরেকদল স্বার্থপরের হাতে বন্দি হয়েছে।কিন্তু নাইমকে ইবনে সাদেকের প্রস্তাবে রাজি হতে না দেখে তার পুরনো খেয়াল বদলে গেছে।প্রথম প্রথম সে তাকে মনে করতো মজলুম কৃপার পাত্র।কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই নাইম , জুলাইখার কাছে হয়ে ওঠলেন অন্তহীন শ্রদ্ধার দাবিদার।

বাবা মায়ের মর্মান্তিক পরিণতির খবর জুলাইখা জানতো না।তাদের সাথে মিলিত হবার কামনা জানিয়ে সে হতাশ হউএ গেছে।তার কাছে দুনিয়া এক অবাস্তব স্বপ্ন আর পরকাল এক নিছক কল্পনা।
জুলাইখা প্রতি রাতে কোনো না কোনো সময় নয়ীমের কুঠরিতে এসে খানাপিনার ব্যবস্থা ছাড়াও নাইমের অন্ধকার কুঠরিতে রেখে যায় খানিকটা আশার আলো।

চারদিন পর আবার নাইমকে হাজির করা হলো ইবনে সাদেকের সামনে। ইবনে সাদেক নাইমের শারীরিক অবস্থার কোন পরিবর্তন না দেখে হয়রান বলল! তোমার জান বড্ড শক্ত। হয়তো আল্লাহতালার ইচ্ছা তুমি জিন্দা থাকবে।কিন্তু তুমি নিজ হাতে নিজের মৃত্যু ক্রয় করছো।আমি এখনো তোমাকে চিন্তা করার সময় দিচ্ছি।আমার দৃঢ় বিশ্বাস তোমার ভাগ্যের সেতারা খুবই বুলন্দ। কোনো বড় কর্তব্য পালনের জন্য তুমি জন্মেছো।আমি তোমাকে সেই উচ্চস্তরে পৌছবার ওয়াদা করছি তামাম ইসলামি দুনিয়ায় যেখানে তোমার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না।
আমি তোমার দিকে দোস্তির হাত প্রসারিত করছি এটাই তোমার শেষ সুযোগ। এবার আমার আন্তরিকতাকে উপেক্ষা করলে
শেষ পর্যন্ত পস্তাবে।
: নাইম বললেন! ইতর কুত্তা কোথাকার আমাকে কেন বারবার বিরক্ত করছো। যদি পারো আমকে মেরে ফেলো। আর যদি ভুলেও আমি এখান থেকে ছুটে যেতে পারি তাহলে তোমার অবস্থা কি হবে আমি নিজেও জানি না।
:এ ইতর কুত্তার কামড় কখনো সুখের হবে না।এই ইবনে সাদেক আসন ছেড়ে উঠে ইসহাকের কাঁধে হাত রেখে বললেন! ইসহাক এখন শুধু একটা কাজ বাকি আমি চাই মুহাম্মদ ইবনে কাসেমের মস্তক তার সাথে দাফন করতে। তুমি যদি সেই কাজ করে দিতে পারো তাহলে কথা দিচ্ছি আমি জুলাইখার সাথে তোমার বিবাহ দেব।এই কথা বলে ইবনে সাদেক জুলাইখার দিকে তাকালেন। জুলাইখা অশ্রুভরা চোখে দৌড়ে চলে গেল নিজের কামরায়।
ইবনে সাদেক নাইমের দিকে তাকিয়ে বলল! আমি জানি মুহাম্মদ ইবনে কাসেমের প্রতি তোমার কত মুহাব্বত। আমি ওয়াদা করছি যদি তার মস্তক এখানে পৌছা পর্যন্ত তুমি জীবিত না থাকো তাহলে তার মস্তক তোমার লাশের সাথে দাফন করবো।
ইবনে সাদেকের হুকুমে সিপাহীরা নাইমককে রেখে গেল কয়েদখানায়।

রাতেরবেলা নাইম কয়েদখানার চার দেয়ালের ভেতরে পায়চারি করতে লাগলেন।হঠাত যেন কার পায়ের  আওয়াজ তার কানে এসে পৌছালো।
কুঠরির ছিদ্র দিয়ে তিনি তাকিয়ে তাকে চিনি ফেললেন। সে ছায়ামূর্তিটি জুলাইখা।তাকে বেশ পেরেশান মনে হচ্ছে।
নাইম প্রশ্ন করলেন! কে তুমি?আমি স্বপ্ন দেখছি নাতো।
: না এই স্বপ্ন নয় বাস্তব। কিন্তু আপনি পড়ে গেলেন কেন?
:কখন?
:এইতো এখনই। আমি যখনাপ্নাকে আওয়াজ দিচ্ছিলাম আপনি ঘাবড়ে গিয়ে পড়ে গেলেন।
:উহ... আমি এক স্বপ্ন দেখছিলাম, আমি অনুভব করছিলাম যেনো আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি।আযরা আমায় ডাকছে আমি এগিয়ে যাচ্ছি তার দিকে অমনি কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম।কিন্তু আপনি এখানে?
:জুলাইখা বলল! আস্তে কথা বলুন! যদিও তারা সবাই ঘুমিয়ে আছে।আপনার কথার আওয়ার তাদের কানে পৌছালে সব কৌশল ব্যর্থ হয়ে যাবে।নিজের সব গয়না-গহনা ওদেরকে দিয়ে কুঠরির দরজা খুলিয়েছি।ওরা ওয়াদা করেছে দুটো ঘোরা তৈরী করে দিবে।আপনি চলুন আমার সাথে।
:দুটো ঘোড়া কেন?
:আমিও আপনার সাথে যাবো।
:আমার সাথে?
:হ্যাঁ.. আপনার সাথে, আমার বিশ্বাস আপনি আমাকে আমার বাবা মার কাছে দামেস্কে পৌছে দিবেন।
:আপনি এখানে এলেন কি করে?
:ওহ.... কথা বলার সময় নেই এখন,আপনি জলদি আসুন!
নাইম খানিকটা ইতস্ততা করে বললেন! না না আপনার সাথে এখন আমার যাওয়া ঠিক হবে না।আপনি আশ্বস্ত হোন কয়েকদিনের মধ্যে আমি আপনাকে এ লোকটির হাত থেকে মুক্ত করবো।
:না না, আল্লাহ'র দিকে তাকিয়ে আমায় হতাশ করবেন না।জুলাইখা কেঁদে কেঁদে বলল!আপনার সাথেই যাবো আমি।আপনি চলে যাওয়ার পর যদি ওরা জানতে পারে আপনাকে মুক্ত করার পিছনে আমার হাত ছিলো তাহলে ওরা আমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিবে না।
নাইম খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন!আপনি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে চলতে পারবেন?
জুলাইখা আশান্বিত হয়ে জবাব দিলো আমি এই জালেমের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবকিছু করতে পারবো।এখন সময় নষ্ট না করে চলুন।এক পাহারাদার আপনার সব হাতিয়ার নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

নাইম জুলাইখার হাত ধরে কুঠরির বাইরে এলেন।এমন সময় কার যেনো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। নাইম জুলাইখার মুখে হাত দিয়ে ধরে রাখলেন আস্তে আস্তে তারা দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে এগিয়ে গেল বাইরে তখন দেখলো এক সিপাহি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নাইম তার হাত দিয়ে একটা ঘুষি দিল সিপাহির নাক বরাবর অমনি সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

কেল্লার বাইরে এক সিপাহি নাইমের নজরে পড়লো সে তাদের জন্য দরজা খুলে দিল।আরেক সিপাহি নাইমের হাতিয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাইম তার হাতিয়ার বেধে নিলেন।জুলাইখাকে একটি ঘোটায় সওয়ার করালেন। নাইম সিপাহিদের দিকে ফিরে বললেন! তোমরা কি নিশ্চিত আমাদের জন্য তোমাদের জান বিপন্ন হবে না।
সিপাহি বলল!আপনি আমাদের জন্য চিন্তা করবেন না। ভোর হবার আগেই আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাবো।
তাদের বিদায় দিয়ে নাইম এবং জুলাইখা ঘোড়া হাকালেন।অগ্রসর হতে লাগলেন তারা সামনের দিকে।

চলবে..... ইনশাআল্লাহ।

 

লেখকঃ উপন্যাসিক নসীম হিজাজী

Post a Comment

0 Comments