Printfriendly

মৃত্যু যদি নির্ধারিত হয় তাহলে আত্মহত্যা হারাম কেন?

আত্মহত্যা

 কিছু দিন আগে এক বোন ইনবক্সে এই প্রশ্নটা করেছে আমাকে। প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার পর মনে হলো এই প্রশ্নটা আসলে হেদায়েত প্রাপ্ত অনেক ভাই-বোনের মাথায়ও ঘুরপাক খায়। এজন্য পাব্লিক্যালি পোস্ট করতে ইচ্ছে হলো। আশাকরি ধৈর্যসহকারে পড়বেন সবাই।উপকৃত না হলেও সময় অপচয় হবে না ইন শা আল্লাহ।

আত্মহত্যা মহাপাপ আমরা সবাইই জানি। আবার মৃত্যু নির্ধারিত সময়ে আসবে কুরআন হাদিসের আলোকে এও আমরা জানি। তাহলে এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে মৃত্যু যদি নির্ধারিত সময়ে আসবে ই তাহলে আত্মহত্যা পাপ কেন?

প্রশ্নটার উত্তর জানতে হলে আসুন কিছু উদাহরণে চোখ বুলিয়ে নেই।

তবে উদাহরণে যাওয়ার আগে স্রষ্টা সম্পর্কে আমাদের কনসেপ্ট ক্লিয়ার হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমে আমাদের স্রষ্টা সম্পর্কে বুঝতে হবে যে, স্রষ্টা কাকে বলে। অন্যান্য ধর্মের মতো আমাদের ইসলাম না। তারা তাদের স্রষ্টাকে সিফতের (বৈশিষ্ঠ্যের) ভিত্তিতে খন্ড বিখন্ড করে ফেলেছে। যেমন হিন্দুদের কথা যদি  বলি, তারা মনে করে সাপের হাত থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা একমাত্র মনসা দেবীর আছে, বিদ্যার জ্ঞান দিবেন স্বরস্বতী দেবী, অসুর থেকে রক্ষা করবে কালী ইত্যাদি নাউজুবিল্লাহ! এগুলো সব ভ্রান্ত মতবাদ।

কিন্তু আমাদের স্রষ্টা এই রকম নন, তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তিনি সকল কিছু শুনেন ও জানেন, সকল দোষ ত্রুটি থেকে উনি পবিত্র এমনকি উনার গুনাবলী সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায় উনার ৯৯টি নাম থেকে। আমাদের উদ্দেশ্য ঐগুলো না। এই প্রশ্নটি বুঝার জন্য আমাদের যতটুকু দরকার ততটুকু নিয়ে আমরা আলোকপাত করবো ইংশা আল্লাহ।

১) উনি স্রষ্টা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হলো উনার এই স্রষ্টার সিফত, উনি আমাদেরকে সৃষ্টি করার আগেও ছিলো, এখনো আছে, এমনকি সকল মাখলুক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও থাকবে। এমন না যে, উনি আগে স্রষ্টা ছিলেন না, যে দিন থেকে মাখলুক সৃষ্টি করেছে সেই দিন থেকেই স্রষ্টা।  নাউজুবিল্লাহ।
বরং আমাদের সৃষ্টি না করলেও  স্রষ্টার গুনাবলী উনার মাঝে বিদ্যমান।

২) উনি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সৃষ্টির আগেও জানতেন, এই সময়গুলোতে কি হবে,  আর সময় সৃষ্টি করার পরেও উনি জানেন কি হবে, আর কি হবে না।
আমরা রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ভবিষ্যৎতে, এমনকি হাশরের ময়দানে কি হবে সবকিছু আল্লাহর ওহির মারফতে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন।  এর অর্থ আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের দুনিয়ার সময়মাত্রা ছাড়াও পরকালীন সময়মাত্রা সম্পর্কে জানেন। আর না জানলে উনি কিভাবে 'আল্লাহ' হতে পারেন!

এবার আসি মূল কথায়,

 মানুষ ও জ্বীন জাতি ছাড়া, সৃষ্টির সকল কিছু আল্লাহর হুকুমে পরিচালিত হয়। আল্লাহ মানুষ ও জ্বীন জাতিকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে তাদেরকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিয়ে দিয়েছে, আর দিয়েছেন পথনির্দেশ, আর ঐ পথের সীমা ও পরিসীমা। কি করলে সীমা অতিক্রম হবে, হলে কোথায় যেতে হবে আর কি কি করলে সীমার মধ্যে থেকে জান্নাতে যেতে পারবে তাও বলে দিয়েছেন। শুধু স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিতে হস্তক্ষেপ করেননি।

এবার আসুন আল্লাহ,  আপনাকে আমাকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিলে আপনি আমি কি করবো, সেটা উনি জানেন উনার স্রষ্টার সিফতের কারনে। এই কারনে উনি সেটা লিখে রেখেছেন তাকদীর হিসেবে। এটার অর্থ এটা না যে, উনি লিখে রেখেছে বিধায় আমরা সেই কাজ করতেছি।

 আচ্ছা এবার দুই একটি উদাহরণ দেই তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে ইংশা আল্লাহ।

১) মনে করুন আপনি দশজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। অভিজ্ঞতার আলোকে  আপনি বলতে পারবেন কে পাশ করবে, আর কে করবেনা।  কে জিপিএ ৫ পাবে,  আর কে পাবে না। মনে করুন এটা আপনি লিখে রাখলেন আপনার নোটপ্যাডে।

এখন ধরুন আপনার ছাত্র যার রোল ১ সে জিপিএ ৫ পেয়েছে, আর যার রোল ১০০ সে ফেল করেছে। এখন ফেল করা ছাত্রকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়,  তুমি কেনো ফেল করেছো? আর সে যদি বলে, "স্যারে আমার নাম ফেল যাওয়া ছাত্রদের তালিকায় লিখে রেখেছে, তাই আমি ফেল করেছি।"

আপনিই বলুন এই কথা কেউ বিশ্বাস করবে? বিবেকবান কেউ বিশ্বাস করবেনা কোনদিন ও।

ঠিক সেই রকম আপনি আমি,  জ্বীন জাতি,  মানব জাতি ভবিষ্যতে কি করবো আর কি করবো না, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা  আগে থেকেই জানেন বিধায় সেটাই তাকদীরে লিখে রেখেছে।

২) মনে করুন আপনি গোসল করতে গেছেন। সাথে  নিয়ে গেছেন আপনার শখের মোবাইল ও দশ বছরের ছেলেকে। ছেলের হাতে মোবাইল দিয়ে বললেন,  "বাবা মোবাইল যেন পানিতে না পড়ে, পড়লে নষ্ট হয়ে যাবে"।

এবার কোনো কারনে ছেলের হাত থেকে মোবাইলটা পানিতে পড়ে সত্যি সত্যিই নষ্ট হয়ে গেলো। এখন যদি ছেলে বলে,  " বাবা তুমি বলার কারনে পানিতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে" তাহলে কি এটা কেউ বাবার দোষ ধরবেন নাকি ছেলের দোষ।  অবশ্যই ছেলের দোষ।

এটা বলার সুযোগ নেই যে, বাবা জানতেন পানিতে মোবাইল পড়লে নষ্ট হয়ে যাবে,  সেইকারণে মোবাইল নষ্ট হয়ে গেছে। বরং পানিতে পড়লে নষ্ট হয়ে যাবে এটাই মূল বিষয়।

৩)ধরুন আপনার চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটাকে নিয়ে হাঁটতে বেরুলেন পিচঢালা রাস্তায়। চারদেয়ালে বন্দি থাকা আপনার মেয়েটা বাইরের খোলা পরিবেশে এসে তিড়িংবিড়িং লাফালাফি শুরু করলো মনের আনন্দে।আপনি সতর্ক করে দিলেন যে রাস্তায় পড়লে হাত-পায়ে চামড়া ছিলে যেতে পারে। কিছুক্ষণ শান্ত হলেও আপনার চোখে ফাঁকি দিয়ে ছোট্ট সোনাটা লাফালাফি করতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। ব্যথায় তার কপাল কুঁচকে গেলো সাথে সাথেই। এখন মেয়ে যদি গাল ফুলিয়ে আপনাকে বলে যে, "বাবা তুমি বলাতেই আমি পড়ে ব্যথা পেয়েছি। তুমি অমন টা না বললে আমি পড়ে ব্যথা পেতাম না" এটা কি আপনি মেনে নেবেন?

বিষয় টা আপনার বলার সাথে সম্পৃক্ত নয়,বরং মেয়ের অসচেতনতা ই এখানে দায়ী।

অতএব আল্লাহ জানেন স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিলে একটি লোক সুইসাইড করে  জাহান্নামে যাবে, তাই উনি ঐ ব্যক্তির তাকদীরে এটা লিখে রেখেছেন। এখানে এটা বলার সুযোগ নাই যে, আল্লাহ লিখে রেখেছেন বিধায় সে সুইসাইড করেছে।
আল্লাহু আলম!

এরপরেও কারও বুঝে না আসলে, যদি সত্যান্বেষী হন তাহলে আহুলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা পড়ার অনুরোধ রইলো।

আচ্ছা যাক ভাই/বোন!  কেনো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমরা এরকম সংশয় নিয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছি হয়তো। যদি এরকম সংশয়ে কেউ পড়েন তাহলে  আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আপনার নাম জান্নাতীদের সাথে থাকে আর সেই অনুযায়ী আমল করুন। তাহলে অন্তত আপনার  যুক্তি অনুযায়ী জাহান্নাম দিলে, আল্লাহকে বলতে পারবেন আল্লাহ আমিতো আমার সাধ্য ও জ্ঞান অনুযায়ী আমল করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

কিন্তু সংশয় নিয়ে মারা গেলে কিছু বলার কি উপায় আছে ভাই!

আর একটা পরামর্শ থাকবে এসব সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে সবসময় দূরে থাকার চেষ্টা করবেন। 'আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম' এই নীতি অবলম্বন করুন যতদিন এই জঞ্জালময় দুনিয়ায় বেঁচে আছেন। ইসলাম যেটাকে হারাম বলেছে কোন যুক্তিতর্কে না গিয়ে সেটাকে হারাম হিসেবে মেনে চলুন। যেটাকে হালাল বলেছে সেটাকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন।

আপনি যখন সংশয়পূর্ণ  কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে থাকেন তখন শয়তান আপনাকে আরও বেশি ওয়াসওয়াসা দিতে থাকে।আর আপনি একপর্যায়ে ইমান থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। এজন্য এসব বিষয় থেকে দূরে থাকুন। বেশি আমল নিয়ে যেতে না পারি, অন্তত ইমান টুকু নিয়ে তো আমাদের যেতে হবে যদি আখিরাতে চির শান্তির স্থান জান্নাতে যেতে চাই।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের সবাইকে ইমান নিয়ে অনন্তকালের যাত্রায় পা রাখার তাওফিক দিক।

লিখেছেনঃ মারদিয়া রুহিন মারজুখা।

Post a Comment

0 Comments