Printfriendly

আপনি লিখতে চান কিন্তু.....


 

 

শুনেছি, আপনি লিখতে চান। লেখালেখির মাধ্যমে দা'ওয়াতি ময়দানে এবং ইসলামি সাহিত্য অঙ্গনে যে বিপ্লব ঘটছে সেখানে অংশ নিতে চান। কিন্তু লিখতে গেলেই নানান চিন্তা এবং সমস্যা এসে ভীড় জমায় আপনার হৃদয় কোণে। সেইসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় সহ বিভিন্ন পরামর্শ নিয়েই আজ আপনার সাথে কথা বলতে চাই।

- লেখালেখি খুব কঠিন একটা কাজ।

শুরুতেই আপনি যদি উল্লেখিত ধারণা নিয়ে বসে থাকেন এবং শুধুমাত্র এর উপর ভিত্তি করে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন তাহলে মস্ত বড় ভুল করছেন। মূলত লেখালেখি হলো আপনার হৃদয় হতে উৎসারিত ভাবের সৌন্দর্য, চিন্তার স্নিগ্ধতা এবং অনুভূতির পবিত্রতা প্রকাশের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। আপনি এই মূহুর্তে যা ভাবছেন, যে অনুভূতি ব্যক্ত করতে চাচ্ছেন তা যদি কারোর জন্য শিক্ষণীয় হয় এবং দা'ওয়াহর মাধ্যম হয় তাহলেই লিখে ফেলুন। হতে পারে লেখার বিষয়বস্তু হবে খুব সাধারণ, শব্দের মধ্যে থাকবে না ঝঙ্কার, বাক্যগুলোও খুব একটা সাজানো-গোছানো হবে না। তবুও শুরু করুন। লিখতে থাকুন। তারপর ধীরে ধীরে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুনিপুণভাবে লক্ষ করুন,কোন বাক্যে পরিবর্তন আনলে, কোন শব্দ বিচিত্র হলে,কোন বিরামচিহ্নের সঠিক ব্যবহারে আপনার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, বাক্যের সৌন্দর্য এবং সাহিত্যমান আরো সমৃদ্ধ হবে। চিন্তায় সৃজনশীলতা, বানানে নির্ভুলতা, শব্দের বিচিত্রতা, ব্যাকরণের নিয়মনীতি, বিরামচিহ্নের ব্যবহার এসব হচ্ছে সাহিত্যের প্রাণ কিন্তু একদিনে শেখার মতো কোন বিষয় নয়। লিখতে লিখতে, শিখতে শিখতেই আপনার সম্পাদনার দৃষ্টি শাণিত হবে, আপনার লেখনী শক্তিশালী হবে এবং আপনার কাগুজে মানস-সন্তান পূর্ণতা লাভ করবে।

তবে একটা কথা, 'লেখালেখি খুব কঠিন' এই ধারণা নিয়ে লিখতে বসবেন না। নিজের মন এবং মেধার ওপর জোরপূর্বক চাপানোর চেষ্টা করবেন না। তাহলে সেই লেখনীর ধরণ পরীক্ষার খাতায় না বুঝে উগড়ে দিয়ে আসা মুখস্থবিদ্যের মতো শুষ্ক খটখটে হয়ে যাবে।

- আমি আমার প্রিয় লেখকের মতো লিখতে পারি না।

মানুষ অনুকরণপ্রিয়। লেখালেখির ক্ষেত্রেও আমরা অনেকেই প্রিয় লেখকের শব্দচয়ন, লেখার ধরণ, প্রকাশের ভঙ্গিমা অনুসরণ করার চেষ্টা করি৷ কখনো কখনো তার অসাধারণ লেখা পড়ে বলে উঠি, 'আহ! আমিও যদি এমন লিখতে পারতাম'। এই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা খারাপ কিছু না, পছন্দের লেখককে অনুসরণ করে স্বীয় লেখনশৈলীর উন্নতি ঘটানোও দোষের কিছু নয়। কিন্তু লেখালেখির একদম সূচনালগ্নেই নিজের কাছে 'অসাধারণ' কিছু প্রত্যাশা করা নিতান্তই বোকামি। আজ যিনি এবং যারা আপনার প্রিয় লেখকের আসনে অধিষ্ঠিত, যাদের লেখনী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর তারা কিন্তু একদিনেই এসব অর্জন করেননি। বহু ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং সময়ের গল্প লুকিয়ে আছে এর পেছনে। অথচ দেখুন, আপনি প্রথম প্রথম কাগজ- কলমে হাত রেখেই নিজের কাছে একেকটা 'মাস্টারপিস' লেখা আশা করছেন এবং না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন। ব্যাপারটা কি একটু বোকামি হয়ে গেল না?

- আমি দ্বীনি প্রেক্ষাপটে লিখতে চাই কিন্তু আমার ইলম নেই।

আমাদের দ্বীন কোন মানবসৃষ্ট ধর্ম নয়। বরং এটি আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন বিধান। তাই আপনাকে দ্বীন নিয়ে লিখতে হবে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে। আপনি গল্প লিখুন, প্রবন্ধ লিখুন, কবিতা লিখুন যাই লিখুন না কেন দ্বীনি বিষয়ক হলে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট এবং সঠিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। শুধুমাত্র কল্পনার উপর ভিত্তি করে আর আবেগের মিশেল দিয়ে সাধারণ লেখা লিখলেও দ্বীন নিয়ে লেখার জন্য আপনার ইলম থাকা চাই। তাই ইলম অর্জন করতেই হবে।

- আমি কি উদ্দেশ্যে লিখছি?

পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিকগণ জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করার পরেও লেখালেখি থেকে অবসর নিয়েছেন। কারণ তাদের লেখা নিয়ে কোন উদ্দেশ্য ছিল না। তাই আপনি কাকে নিয়ে লিখছেন, কি উদ্দেশ্যে লিখছেন, কেন লিখছেন এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার লেখার মূল উদ্দেশ্য হয় যদি দা'ওয়াহ এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হয় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন তাহলে নিয়্যাতের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে অসতর্ক একেবারেই হওয়া যাবে না। কারণ নিয়্যাত সাহিহ্ না হলে লেখার বিনিময়ে কোন নেকি তো পাবেনই না বরং রিয়াকারীর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।

- আমি তো দারুণ লিখি!

সবশেষে এবার আপনি লিখতে বসেছেন। প্রায়ই লিখছেন। সব লেখাই যে ভালো হচ্ছে এমন নয়। তবে যেসব ভালো হচ্ছে সেখানে মানুষ প্রশংসা করছে।
- বাহ! আপনি তো দারুণ লিখেন।
- ইশ! আমিও যদি আপনার মতো লিখতে পারতাম।
- আপনার লেখা অসাধারণ!

এবার আপনাকে সতর্ক হতে হবে। আপনি যদি প্রশংসাসূচক এসব বাক্যের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে নিজেকে দারুণ লেখক ভাবতে শুরু করেন তাহলেই আপনার বিপর্যয় শুরু। যখন আপনি মনে করবেন, আপনার সৃষ্টিকর্ম শিখরে উঠে গেছে তখন আপনি সম্পাদনার প্রয়োজন বোধ করবেন না, আপনার হৃদয় সুস্থ সাহিত্যের খোঁজ করবে না, আপনার চিন্তাজগতে ঝড় উঠবে না, আপনার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি আপন ভুলগুলো এড়িয়ে যাবে। যে সুপ্ত বাসনা, তীব্র আকাঙ্খা এবং পবিত্র ইচ্ছে নিয়ে আপনি এ জগতে পদার্পণ করেছিলেন সেই সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে রিক্ত হস্তে ফিরতে হবে। এ কারণেই নবীন লেখকদের প্রতি প্রবীণদের একটি মূল্যবান পরামর্শ থাকে- 'আত্মমুগ্ধ হয়ো না। নিজের লেখায় মুগ্ধ হয়ে থাকলে ভালো লেখা হয়ে উঠবে না'।

- খ্যাতির বিড়ম্বনা

আজকাল আপনি ভালো লিখছেন। লিখতে লিখতে আপনার লেখনীতে পরিপক্কতা এসেছে। এখন লেখালেখি আপনার কাছে কঠিন কিছু মনে হয় না। চিন্তাভাবনা, অনুভূতিগুলো যেন খুব সহজে গোছানো কথামালায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। লেখালেখির মাধ্যমে দা'ওয়াহ দেওয়াও হয়। এটা আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত একটি রহমাহ এবং আপনার দীর্ঘ অনুশীলনের ফলাফল। সবকিছু ঠিক থাকলেও নতুন এক বিড়ম্বনা এসে যোগ হয়েছে। এখন অনেকেই আপনাকে চেনে, আপনার কাছ থেকে প্রতিটা বিষয়ে বড় বড় লেখা আশা করে। আপনাকে বিরাট কিছু ভাবে। এসব মাঝেমধ্যে আপনাকে আত্মঅহমিকায় ভোগায়।

আবার সতর্ক হন। নিজের নিয়্যাত যাচাই করে নিন। কি উদ্দেশ্যে লিখছেন তা নিয়ে ভাবুন। আত্ম অহমিকা ও খ্যাতি সম্পর্কে হাদিস এবং সালাফদের বাণীসমূহ পড়ুন। খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বেশি বেশি দু'আ করুন। আশা করা যায়, রহমানের বান্দা হিসেবে আপনি বিনয় অবলম্বন করবেন।

এবার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলি। আপনাকে দু'আ করতে হবে। প্রচুর পরিমাণে দু'আ করতে হবে। তার কাছেই তো চাইতে হবে, যিনি মস্তিষ্ককে চিন্তাধারণের ক্ষমতা দান করেন, যিনি অন্তরের সম্মুখে ভাবনার দুয়ারকে উন্মোচিত করেন, যিনি বাক্যের সৌন্দর্যতা, শব্দের বিচিত্রতা, প্রকৃতির রূপ-রস উপলব্ধি করার মতো হৃদয় দান করেন, যিনি হাতকে কলম আঁকড়ে ধরে ভাবনাগুলোকে কাগজে ফুটিয়ে তোলার যোগ্যতা দান করেন। তিনিই তো তো রব্বুল কলম। তিনি তাওফিক দান করলেই তো সম্ভব!

.
সময়ের পাটাতনে দাঁড়িয়ে কাগজ-কলমের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলা ভীষণ প্রয়োজন। এতোকাল আমাদের অপারগতা, অবহেলা এবং অবিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে আহলে বাতিলরা সাহিত্যকে করেছে দূষিত। আর দূষিত সাহিত্য আমাদের হৃদয়কে করেছে অপবিত্র। তাই এবার শক্ত হাতে শাণিত কলমে সেইসব কলম জাদুকরদের তেলেসমাতি ভস্ম করে দিতে হবে। দু'আ এবং অধ্যাবসায়ের দ্বারা কলমকে তৈরি করতে হবে যুগের তেজস্বী বাহন শ্রেষ্ঠ হিসেবে। যে বাহনে আরোহন করে আগমন করবে সোনালি যুগের শ্রেষ্ঠ ইলমের দীপ্তিময় আলোকছটা। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।
.
আজ তো আপনার সাথে লেখালেখি নিয়ে অনেক আলাপ হলো। লেখালেখি শুরুর আগের ও পরের নানাবিধ চিন্তা এবং বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার আমি আপনার কাছ থেকে একটা লেখা তো আশাই করতে পারি তাই না? লেখালেখির জগতে আপনাকে জানাই উষ্ণ অভ্যর্থনা। আহলান ওয়া সাহলান!

মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ সাহেবের একটি অসাধারণ উক্তি দিয়ে আজ সমাপ্তি টানছি -

"কলম যখন গ্রহণ করে কলমের কালির বন্ধন এবং কালি যখন গ্রহণ করে চোখের পানির মিশ্রণ ; হাতের স্পর্শ ছাড়িয়ে কলম যখন লাভ করে হৃদয়েরও স্পর্শ তখন কলমের মুখ হয় আলোর ফোয়ারা এবং কল্যাণের ঝর্ণাধারা। সেই কলমের একটি শব্দ হীরকখণ্ড কুহে নূরের চেয়ে মূল্যবান।
আমরা কি পেরেছি কলমে কলবে বন্ধন সৃষ্টি করতে এবং কলমের কালিকে চোখের পানির উষ্ণতা দিতে? কেন পারি না? কেন আমরা কলমের কথা ভাবিনা!"

||আপনি লিখতে চান কিন্তু...||

লেখকঃবিনতে আব্দুল হান্নান।(আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন।)

Post a Comment

0 Comments