Printfriendly

লেখক হতে হলে করুণীয় (পর্ব-৪)


 'গল্পগুলো অন্যরকম' বইটা শুরু হয়েছে আমার 'বোধ' গল্প দিয়ে। একবার, অফিস থেকে খিলগাঁও রেলগেইট হয়ে রিক্সায় চেপে বাসায় ফিরছিলাম। এমন সময় আমার মনে একটা গল্প লেখার প্লট এলো। 'খুব মুমূর্ষু কোন রোগিকে কেউ একজন রক্ত দিচ্ছে, আর যাকে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, তার আত্মীয়স্বজনেরা রক্তদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতায় গদগদ। সে না এলে কি যে হয়ে যেতো'- এমন একটা দৃশ্যকল্প সামনে রেখেই আমি গল্পটা বাসায় এসে লিখতে বসেছিলাম।

কিন্তু, গল্পটা শেষ করে আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম! লিখতে বসেছি কি আর আমি লিখে ফেলেছি কী! যা ভেবেছি তার উঠোনে হেঁটেছি বটে, কিন্তু ঢুকে পড়েছি অন্যকোন ভাবনার অন্দরমহলে যা আমার ভাবনার অলিগলিতেই ছিলো না৷

আমার সেই গল্পটা যারা পড়েছেন তারা জানেন গল্পটার শেষ পরিণতি সম্পর্কে৷ মায়ের এক অবাধ্য ছেলের ভাবোধয় হওয়ার মাধ্যমেই গল্পটা পরিণতি পায়। কিন্তু, লিখতে বসার আগে এমন কোন চিন্তা বা এমন কোন দৃশ্যপট আমার কল্পনাতেও ছিলো না।

তাহলে, যা আমার ভাবনাতেও ছিলো না, তাতেই আমি ডুব দিলাম কিভাবে?

আমার মনে হয়, যারা জাত-লেখক কিংবা যাদের জন্মই লেখার জন্যে, তারা কখনো নির্দিষ্ট ফ্রেম সামনে রেখে লিখেন না।  'এভাবে শুরু করবো, এভাবেই শেষ করবো'- এমন কোন ধরাবাঁধা ছক এঁকেই তারা লিখতে বসেন বলে মনে হয় না আমার। তিনি কেবল জানেন তিনি লিখবেন। কলম হাতে নিলে তার হাত থেকে শব্দের ফুয়ারা বের হয়। তিনি হয়তো-বা লিখতে বসেন পাথর, কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটা হয়ে যায় পাহাড়৷ নদী লিখতে বসে কখন যে তিনি সাগরে ঢুকে পড়েন, তা তিনি বুঝতেও পারেন না হয়তো।

জাত-লেখকদের এটাই হয়তো-বা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তার মানে এই না যে, আমি আমাকে জাত-লেখক বলে দাবি করছি। আমার চিন্তা করার ক্ষমতা বড় বেশি সীমাবদ্ধ। আমি কেবল আমার একটা ধারণার কথা লিখেছি যা কাকতালীয়ভাবে আমার সাথে মাঝেমধ্যে ঘটে যায়।

লেখক হওয়ার জন্যে একজন মানুষকে আগে একটা ব্যাপারে সুনিশ্চিত হতে হবে।

লেখালেখিটা তার ভিতর থেকে আসছে কি না?

এই প্রশ্নের উত্তর 'হ্যাঁ' হলে এক সমাধান, যদি 'না' হয়, তাহলে আরেক সমাধান।

যদি উপরের গল্পের মতো, লিখতে বসেই আপনি লেখার মধ্যে ডুবে যান, কলম আপনাকে শব্দ-সমুদ্রে, বাক্য-আকাশে ঘুরিয়ে আনে, তাহলে ধরে নিন লেখক হবার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য আপনার মধ্যে আছে এবং তা আল্লাহ-প্রদত্ত। এই গুণটাকে ধরে রাখতে হলে আপনাকে অনেক বেশি লিখতে হবে। যারা স্বভাব-লেখক, তাদের চিন্তাশক্তিও এ-ব্যাপারে প্রবল এবং প্রকট হয় বলে ধারণা করি৷ মাথা না খেললে কলম চলবে কিভাবে? তাই, লেখার এবং চিন্তার যুগল ক্ষমতা যেহেতু আপনার মাঝে বিদ্যমান, এই গুণের সঠিক পরিচর্যা করে সেটাকে আরো হৃষ্টপুষ্ট করে, যত্ন-আত্তির করে সেটাকে আরো বাড়-বাড়ন্ত করে অজস্র-অসংখ্য সৃষ্টিশীল কাজ রেখে যাওয়াই আপনার কর্তব্য।

আবার, যদি লিখতে বসলে আপনার কলম না চলে, যদি শব্দ নিয়ে সহজাতভাবে আপনি খেলতে না পারেন, যদি আপনাকে অনেকবেশি মাথা খাটিয়ে, অনেকবেশি পরিশ্রম করে সঠিক শব্দ খুঁজে আনতে হয়, তাহলে লেখালেখিটা আপনার মজ্জাগত নয়।

তবে, এই বৈশিষ্ট্য মজ্জাগত নয় বলে যে আপনি লিখতে পারবেন না, কিংবা আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, 'ভালো লিখতে পারবেন না', তা কিন্তু মোটেও ঠিক নয়। দুনিয়ার সব লেখক কিন্তু লেখক হওয়ার সবগুলো বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায় না৷ পৃথিবীতে এমন ভুরি ভুরি নজির আছে যেখানে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেককে লেখক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কেউ বিরহে পড়ে কবি হয়েছে, কেউবা ট্রাজেডিতে পড়ে হয়ে গেছে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক। সুতরাং, সর্বদা প্রতিভাই যে সব, তা কিন্তু নয়, পরিশ্রমও মানুষের সামর্থ্যের বেশ অনেকটাজুড়ে বিরাজ করে। তাই, আপনার যদি প্রতিভা না থাকে, সেই ঘাটতিকে পরিশ্রম দিয়ে পূরণ করুন। প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তা হেলায় নষ্ট হয়েছে এমন নজির আমাদের চারপাশে অনেক। কিন্তু পরিশ্রম করে বিফল হয়েছে, এমন সংখ্যা হয়তো-বা হাতেগোনা।

তবে, অনেকে আবার প্রতিভাবে অস্বীকার করতে চায়। তারা বলতে চায়,'প্রতিভা বলে আসলে কিছু নেই'।

আমি তাদের সাথে দ্বিমত করি৷ যারা প্রতিভাকে অস্বীকার করে, আমার মনে হয় তারা মানবীয় গুণের একটা বিশেষ দূর্লভ গুণকে অস্বীকার করেন যা সবাই লাভ করে না।

যদি প্রতিভা বলে কিছু না-ই থাকতো, তাহলে ফুটবলে লাথি দিয়ে আমিও মেসি হয়ে উঠতে পারতাম। কলম ধরলে হয়ে উঠতাম শেক্সপিয়ার,  আর রঙতুলি হাতে নিলে হয়ে উঠতাম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, অথবা নিদেনপক্ষে পিকাসো। কিন্তু আমি জানি, আমি ওসবের কোনোটাই হতে পারবো না৷ পরিশ্রম করলে আমি তাদের ধারেকাছে না হোক, তাদের মতোন চেষ্টা করে 'অনন্য' হয়ে উঠতে পারবো, কিন্তু আমি কোনোভাবেই 'তারা' হয়ে উঠতে পারবো না। তাই, আমি প্রতিভাতে খুব বেশি বিশ্বাস করি।

এখন, লেখক হতে হলে আপনাকে জানতে হবে আপনি প্রতিভাবান, নাকি পরিশ্রমী? দুটোর যৌথ যৌগ নিজের মধ্যে থাকলে তো মারহাবা, যদি প্রতিভাবান হোন, তাহলে নিজেকে বিকশিত করুন৷ আর যদি পরিশ্রমী হোন, তাহলে নিবিড় পরিচর্যায় নিজেকে গড়ে তুলুন।

লেখক হতে হলে-০৪ ।। আরিফ আজাদ

Post a Comment

0 Comments